রাকিব হোসাইন, সাঁথিয়া (পাবনা) প্রতিনিধি :
বর্ষার পানিতে যখন হাওর, বিল ও নিম্নাঞ্চলের হাজার হাজার একর জমি ডুবে যায়, তখনও হার মানে না এক বিশেষ জাতের ধান। পানির গভীরতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে লম্বা হতে থাকা এই ধানই পরিচিত ‘জলিধান’ নামে। প্রকৃতির প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকা এই ধান বাংলার কৃষি ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শন। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, আধুনিক উচ্চফলনশীল জাতের বিস্তার, কৃষিজমির পরিবর্তিত ব্যবহার এবং কৃষকদের আগ্রহ কমে যাওয়ায় দিন দিন কমে যাচ্ছে এই ঐতিহ্যবাহী ধানের আবাদ।
কৃষিবিজ্ঞানীদের মতে, গভীর পানির আমন ধানের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো—পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর কাণ্ডও দ্রুত বৃদ্ধি পায়। সাধারণত ৫০ সেন্টিমিটার থেকে ১ মিটার বা তারও বেশি গভীর পানিতেও এসব ধান বেড়ে উঠতে সক্ষম। এক মিটারের বেশি পানিতে জন্মানো কিছু জাতকে ভাসমান ধান (Floating Rice) হিসেবেও ধরা হয়।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) তথ্য অনুযায়ী, গভীর পানির ধান সাধারণত মার্চ–এপ্রিল মাসে বপন করা হয়। বর্ষায় পানি বাড়লে গাছের উচ্চতাও বাড়তে থাকে এবং নভেম্বর–ডিসেম্বর মাসে কৃষকের ঘরে ওঠে এই ধানের ফসল।
দেশের নিম্নাঞ্চলের কৃষকদের কাছে জলিধান বহু পুরোনো এক কৃষি পদ্ধতির অংশ। বিশেষ করে যেসব এলাকায় বর্ষায় দীর্ঘ সময় জলাবদ্ধতা থাকে, সেখানে এই ধান কৃষকদের জন্য প্রাকৃতিকভাবে অভিযোজিত একটি ফসল হিসেবে ভূমিকা রাখে। একসময় দেশের বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চলে ব্যাপকভাবে জলিধানের চাষ হলেও বর্তমানে এর আবাদ আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, গত কয়েক দশকের তুলনায় এখন এই ধানের চাষ অনেক কম, আর প্রতি বছরই এর আবাদ সংকুচিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে আকস্মিক বন্যা ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে গভীর পানির ধান শুধু একটি ঐতিহ্য নয়, বরং দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
যদিও উচ্চফলনশীল ধানের ব্যাপক চাষের কারণে জলিধানের আবাদ আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে, তবুও এখনো কিছু কৃষক দেশীয় জাতগুলো সংরক্ষণ করে চাষ করে আসছেন। কৃষি গবেষকদের মতে, এসব দেশীয় ধানের জিনগত বৈশিষ্ট্য কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে বন্যাসহিষ্ণু নতুন জাত উদ্ভাবন করা সম্ভব।
তাই বাংলার এই প্রাচীন কৃষি ঐতিহ্য রক্ষায় জলিধানের দেশীয় জাত সংরক্ষণ, গবেষণা, কৃষকদের প্রণোদনা প্রদান এবং আবাদ সম্প্রসারণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন কৃষিবিজ্ঞানী ও সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, এখনই উদ্যোগ না নিলে একসময়ের পরিচিত এই জলিধান ভবিষ্যতে ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়তে পারে।
0 Comments