Header Ads Widget

Responsive Advertisement

১৪ মে'৭১ ডেমরা–বাউশগাড়ির রক্তাক্ত সকাল

 

       এম. আব্দুল হালীম বাচ্চু

১. 

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সেই ভয়াল সময়ে পাবনা জেলার সাঁথিয়া- ফরিদপুর অবস্থিত ডেমরা–বাউশগাড়ি ছিল নিরাপদ আশ্রয়ের শেষ ভরসা। বিশেষ করে আশপাশের হিন্দু পরিবারগুলো, পাকবাহিনীর নির্যাতন থেকে বাঁচতে দূরদূরান্তের গ্রাম ছেড়ে এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছিল। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস—যে মাটিকে তারা নিরাপদ ভেবেছিল, সেখানেই তাদের অনেকের জীবন শেষ হয়। স্থানীয় স্মৃতিচারণ ও গবেষণায় নিহতের সংখ্যা প্রায় ৭৫০ থেকে ৮০০জন বলা হয়।

২. 

১৪ মে সকাল। মানুষ তখনও জানত না, কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ইতিহাসের এক ভয়ংকর অধ্যায় লেখা হবে। ঘরে ঘরে সকালের ব্যস্ততা, উঠানে শিশুদের খেলা, কেউ রান্না করছে, কেউ গোরু নিয়ে মাঠে যাচ্ছে। এমন সময় পাকবাহিনী ও তাদের স্থানীয় দোসররা চারদিক ঘিরে ফেলে। শুরু হয় নির্বিচার গুলি। আতঙ্কে মানুষ দৌড়াতে থাকে, কেউ পুকুরে ঝাঁপ দেয়, কেউ ঘরের আড়ালে লুকোয়। কিন্তু মৃত্যু যেন সেদিন সব পথ চিনে নিয়েছিল।

ডেমরা–বাউশগাড়ির মাটিতে তখন আশ্রয় নেওয়া বহু হিন্দু পরিবার ছিল। তারা নিজেদের ঘরবাড়ি, জমি, স্মৃতি সব ফেলে শুধু প্রাণ নিয়ে এসেছিল। কারও সঙ্গে ছিল ছোট শিশু, কারও বৃদ্ধ বাবা-মা। তারা ভেবেছিল এই জনপদ হয়তো তাদের রক্ষা করবে। কিন্তু সেই আশ্রয়ই হয়ে ওঠে মৃত্যুকূপ। পাকবাহিনী ঘরে ঘরে ঢুকে নির্বিচারে হত্যা চালায়। ধর্মবর্ণ, বয়স, লিঙ্গ—কোনো পরিচয়ই তখন কাউকে রক্ষা করতে পারেনি।

৩. 

বৃ-কালিয়ানী, কালিয়ানি, মাজাট, রতনপুর-সহ নানা গ্রামের মানুষ সেদিন একই ভাগ্যের শিকার হয়। কেউ আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল, কেউ মন্দিরসংলগ্ন ঘরে, কেউ পরিচিত কারও উঠানে। কিন্তু গুলির ঝড় সব সীমা মুছে দেয়। একই উঠোনে পড়ে থাকে একাধিক গ্রামের মানুষ—একই মাটিতে মিশে যায় ভিন্ন গ্রামের কান্না, ভিন্ন পরিবারের স্বপ্ন।

৪. 

সেদিন শুধু মানুষ মারা যায়নি; বহু পরিবার, বহু বংশ, বহু স্মৃতি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। কারও বাবা নেই, কারও সন্তান নেই, কারও পুরো পরিবারই শেষ। অনেক শিশুই এতিম হয়ে বেঁচে ছিল, কিন্তু তাদের মুখে আর কখনো শৈশবের হাসি ফিরে আসেনি।

৫. 

হত্যাযজ্ঞ শেষে গ্রামজুড়ে ছিল শুধু নিথর দেহ আর আগুনের গন্ধ। স্বজনেরা ভয়ে দিনের পর দিন লুকিয়ে ছিল। পরে ফিরে এসে তারা খুঁজেছে প্রিয়জনের দেহ। কেউ পেয়েছে, কেউ পায়নি। অনেককে একসঙ্গে গণকবরে দাফন করা হয়। আজও সেই কবরগুলো মাটির নিচে চাপা এক ইতিহাস বহন করে।

ডেমরা–বাউশগাড়ির এই গণহত্যা শুধু একটি গ্রামের নয়; এটি আশ্রয়প্রার্থীদের করুণ পরিণতির গল্প। যারা জীবন বাঁচাতে এসেছিল, তারা মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছিল সবচেয়ে নির্মমভাবে। ১৪ই মে তাই শুধু একটি তারিখ নয়; এটি রক্ত, কান্না, আর অগণিত নামহীন শহিদের স্মৃতিতে লেখা এক অমোচনীয় দিন।

৬. 

প্রতি বছর এই দিন এলেই ডেমরা ও বাউশগাড়ির বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। মানুষ স্মরণ করে সেই হিন্দু পরিবারগুলোকেও, যারা নিজেদের ঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে এসেছিল, কিন্তু আর কখনো ফিরে যেতে পারেনি। সেই রক্তাক্ত সকালে বৃকালিয়ানী বাউশগাড়ি গোরস্তানে অবস্থিত স্মৃতিফলক আজও বলে দেয়—স্বাধীনতা এসেছে অসংখ্য নিরীহ প্রাণের বিনিময়ে; তাদের স্মৃতি জাতির হৃদয়ে অম্লান হয়ে থাকবে। ( লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক, পাবনা)।

Post a Comment

0 Comments

বৈশিষ্ট্যযুক্ত খবর

পাবনা জাতীয়তাবাদী পেশাজীবী দলের পরিচিতি ও মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত