Header Ads Widget

Responsive Advertisement

প্রথম শহীদ নারী কবি ও বুদ্ধিজীবী মেহেরুন্নেসার জীবন ও কর্ম

 

ড. মো. মনছুর আলম :

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে দেশের প্রথম শহীদ নারী কবি ও বুদ্ধিজীবী মেহেরুন্নেসার মৃত্যুবর্ষিকী আজ। ১৯৪২ সালের ২০ আগস্ট, কলকাতার খিদিরপুরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। মেহেরুন্নেসা পরিবারে ও পরিচিতদের কাছে তিনি 'রানু' নামে পরিচিত ছিলেন। মাত্র ১০ বছর বয়স থেকে তিনি লেখালেখি শুরু করেন এবং ৫২-এর ভাষা আন্দোলনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক ইস্যুতে প্রখর লেখনী ধারণ করেন। ১৯৫২ সালে তাঁর ‘চাষী’ কবিতা সংবাদ এর ‘খেলাঘর’ পাতায় প্রকাশিত হয়। তিনি বড়দের জন্য লেখা শুরু করেন ১৯৫৪ সালে ‘কাফেলা’ পত্রিকার মাধ্যমে। 

কবি মেহেরুন্নেসার রুচি, ব্যক্তিত্ব, সৌন্দর্য ও কবিতা সমান্তরাল। তাঁর কর্ম, বিশ্বাস এবং অভিপ্রায় ছিল তাঁর কবিতা। তাঁর কবিতায় ফররুখ আহমদের প্রভাব, ইসলামী ভাবধারা, আরবী-ফার্সী শব্দের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। জাগে মখলুখ' জাগে ফুল পাখি' জেগেছে স্বর্ণ সুরুজ' ইত্যাদি। তাঁর বেশিরভাগ কবিতা প্রকাশিত হয় ‘বেগম’ পত্রিকায়। বেগম পত্রিকার সম্পাদক নূরজাহান বেগমের পরামর্শে তিনি স্বদেশ, প্রেম ও প্রকৃতি বিষয়ে আরবী-ফার্সী শব্দের ব্যবহার বর্জন করে কবিতা লিখতে শুরু করেন। তিনি রানু আপা নামে ‘পাকিস্তানি খবর’ এর মহিলা মহল পাতার সম্পাদনা করতেন। কবি হিসেবে তিনি ছিলেন সত্যিকার কবিতাকর্মী। তাঁর খুব আত্মবিশ্বাস ও সাহসিকতা মেহেরুন্নেসার কবি প্রতিভা আদায় করে নিয়েছিল কবি সুফিয়া কামালের স্নেহ আনুকূল্য। ছোট বয়স থেকেই তিনি সংগ্রাম, ইত্তেফাক, বেগম, দৈনিক পাকিস্তানসহ বিভিন্ন পত্রিকা ও ম্যাগাজিনে কবিতা লিখতেন। তাঁর কবিতায় রাজনৈতিক সচেতনতা, রোমান্টিকতা ও প্রতিবাদী সুর ফুটে উঠত।

মেহেরুন্নেসা বাংলা একাডেমিতে কপিরাইটার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৬১ সালে যোগ দেন ফিলিপস রেডিও কোম্পানিতে। ফিলিপস রেডিও মূলত ইংরেজি ও উর্দুতে মুখপত্র ছাপাতো। কবি মেহেরুন্নেসার চেষ্টায় বাংলা ভাষায় রচিত পত্রিকাও প্রকাশে বাধ্য হয় ফিলিপস কর্তৃপক্ষ। এছাড়া তিনি ইউএসআইএস লাইব্রেরিতেও অনুলিখনের কাজ নিয়েছিলেন।  

কবিতার প্রতি ভালবাসা, বাংলা সাহিত্যের প্রতি অকৃত্রিম আকর্ষণ তাঁকে সাহিত্য চর্চা থেকে দূরে থাকতে দেয়নি। 'রানু আপা' ছদ্মনামে রাজনৈতিক প্রবন্ধ লিখেছেন ৬৯ এর আইয়ুববিরোধী উত্তাল গণআন্দোলনে।

মেহেরুন্নেসা নিজ প্রচেষ্টায় মিরপুরের ৬ নং সেকশনে, ডি ব্লকের ৮ নং বাড়িটি বাবার নামে বরাদ্দ নিতে পেরেছিলেন বিধায়  ১৯৬৩ সালে তিনি সপরিবারে বসবাসের জন্য ওই বাড়িতে ওঠেন। সে সময় মিরপুর ছিল বিহারী অধ্যুষিত এলাকা। এ এলাকায় তিনি ও তাঁর পরিবার ধীরে ধীরে  হয়ে উঠেন মুক্তিকামী বাঙালি পরিবার হিসেবে। 

কবি মেহেরুন্নেসা বিহারীদের হুঁশিয়ারি উপেক্ষা করে, তাঁর দুই ভাই মিরপুর ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সদস্য রফিক ও টুটুলকে নিয়ে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ডাকা কর্মসূচীর অংশ হিসেবে ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ সকাল ১০টায় মিরপুরের ৬ নম্বর সেকশনের ডি-ব্লক, ১২ নম্বর রোডে নিজ বাড়িতে বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতাকা উত্তোলন করেন। এছাড়া ২৩ মার্চ বিকেলে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে লেখক সংগ্রাম শিবির আয়োজিত বিপ্লবী কবিতা পাঠের আসরে হাসান হাফিজুর রহমান, আহসান হাবীব, শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, আলাউদ্দিন আল আজাদ, হুমায়ুন কবিরসহ অন্য কবিদের সঙ্গে স্বরচিত কবিতা পাঠে অংশ নেন। এ আসরে সভাপতিত্ব করেছিলেন ড. আহমদ শরীফ। সেই অনুষ্ঠানে তিনি 'জনতা জেগেছে' কবিতাটি আবৃত্তি করেন। ৭১ এ বিহারী অধ্যুষিত মিরপুরে কবি কাজী রোজীর নেতৃত্বে এ্যাকশন কমিটি গঠন করা হয়। কবি মেহেরুন্নেসা এই কমিটিরও  সক্রিয় সদস্য ছিলেন। এছাড়া ১৯৭১ সালে অসহযোগ আন্দোলনের সময় 'জনতা জেগেছে' কবিতা লিখে তিনি জনমত তৈরিতে ভূমিকা রাখেন।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত থেকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর একতরফা গণহত্যা শুরু হয়। এর দুদিন পরেই কবি ও তাঁর পরিবারের ওপর নেমে এলো ইতিহাসের এক জঘন্যতম কালো অধ্যায়। ২৭ মার্চ, বিহারী ও পাকিস্তানি সৈন্যরা কবি মেহেরুন্নেসার মাথার চুল ধরে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যায় এবং রামদা দিয়ে গলা কেটে তাঁকে হত্যা করে। এভাবে ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ মিরপুরে নিজ বাসভবনে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসররা তাঁকে নৃশংসভাবে হত্যা করে।

কবি মেহেরুন্নেসা স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলাদেশের প্রথম শহীদ নারী কবি। বাংলা একাডেমি তাঁর জীবন ও সাহিত্য নিয়ে 'শহীদ কবি মেহেরুন্নেসা' নামে জীবনীগ্রন্থ প্রকাশ করেছে। কবি মেহেরুন্নেসা তাঁর সাহসিকতা ও লেখনীর জন্য বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন এবং একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে তাঁর নাম চিরকাল ইতিহাসের পাতায়  উজ্জ্বল হয়ে থাকবে। [ লেখক : কবি ও  নদী গবেষক ]

Post a Comment

0 Comments

বৈশিষ্ট্যযুক্ত খবর

পাবনায় সাংবাদিকের বাড়িতে দুর্ধর্ষ চুরি- স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ অর্থ লুট