খালেদ আহমেদ, পাবনা :
ঐতিহ্যবাহী পাবনা সদর গোরস্থান ও ঈদগাহ কমিটির উদ্যোগে ধর্মীয় ও সামাজিক প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করে গোরস্থানের ব্যাপক সংস্কার ও উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে।
কবরের ক্ষতি, অপরিচ্ছন্নতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সীমানা ভাঙন, পানি জমে থাকা এবং ব্যবস্থাপনার নানা সমস্যার কারণে গোরস্থানের সংস্কার অত্যন্ত জরুরি হয়ে ওঠে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে নতুন কমিটি উদ্যোগ গ্রহণ করে বহু বছর ধরে বেহাল অবস্থায় পড়ে থাকা এই গোরস্থানের সংস্কার কাজে হাত দিয়েছে। মানুষের যাতায়াত সহজ করতে গোরস্থানের ভেতরে পথ সংস্কার, নামফলক স্থাপন, রাস্তা নির্মাণ, বসার জায়গা তৈরি এবং আলো স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কবরের মাটি বসে যাওয়া, কবরের পাকা অংশ বা সীমানা ভেঙে যাওয়া, নামফলক বা চিহ্ন নষ্ট হয়ে যাওয়া, আগাছা ও ঝোপঝাড়ে ঢেকে যাওয়া এবং ময়লা-আবর্জনা জমে থাকা—এসব সমস্যাও দীর্ঘদিনের।
এছাড়া বন্যা ও ভারী বৃষ্টিপাতে মাটি সরে গিয়ে কবরের গঠন নষ্ট হয়ে যেত এবং পানি জমে কবরে ও গোরস্থানের সামনে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হতো। ড্রেনেজ ব্যবস্থা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে পড়ে। গোরস্থানের চারপাশের দেয়াল ভেঙে যাওয়ার কারণে শিয়াল ও বেজির মতো প্রাণী ভেতরে ঢুকে পড়ার ঘটনাও ঘটত। একই সঙ্গে গেট ও প্রবেশপথ স্যাতসেতে হয়ে থাকার কারণে সেখানে আসা মানুষদের জন্য নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। মানুষের দান ও আর্থিক সহযোগিতায় পূর্বের ৪৬ বিঘা জমির সঙ্গে নতুন করে আরও ২২ বিঘা ক্রয় ও দানসূত্রে পাওয়া জমি যুক্ত হয়ে বর্তমানে গোরস্থানের আয়তন ৭০ বিঘারও বেশি হয়েছে। এত বড় পরিসরের এই গোরস্থানকে নতুনভাবে সংস্কার ও আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গত ছয় মাস ধরে চলমান সংস্কার কাজের মধ্যে রয়েছে—নতুন কেনা ২২ বিঘা জমিতে মাটি ফেলে ভরাট করা এবং পুরাতনসহ সম্পূর্ণ গোরস্থানে নতুন করে মাটি ফেলে জায়গা উঁচু করা। গোরস্থানের সামনে অবস্থিত পুকুরটি সংস্কার করে চারপাশে পাকা ঘাট নির্মাণ করা হচ্ছে। সেখানে পিলার দিয়ে ঘাট পাকা করা হবে, যাতে মানুষ বসে অজু করতে পারে এবং ব্যবহার করতে পারে। এছাড়া মসজিদের পাশে ফাঁকা জায়গায় একটি নতুন মাদ্রাসা নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যদিও গোরস্থানে আগে থেকেই একটি মাদ্রাসা রয়েছে, যেখানে অনেক এতিম শিক্ষার্থী ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছে।
নতুন কমিটি দায়িত্ব গ্রহণের পর ছয় মাসের মধ্যেই বিদ্যমান দুই তলা বিশিষ্ট মসজিদটি সম্প্রসারণ করে তিন তলায় উন্নীত করা হয়েছে। বর্তমানে পবিত্র রমজান মাসেই সেখানে মুসল্লিরা নামাজ আদায় করছেন। ভবিষ্যতে ভবনটি আরও সম্প্রসারণ করে চার তলা করার পরিকল্পনাও রয়েছে।এছাড়া চারপাশে উঁচু করে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ, পাকা রাস্তা তৈরি, পানির লাইন স্থাপন এবং কল বসানোর কাজও চলমান রয়েছে। তবে এসব উন্নয়ন কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে শেষ করতে আরও দুই থেকে তিন বছর সময় লাগতে পারে।আগে নতুন কবর খননের সময় বড় বড় গাছের শেকড়ের কারণে সমস্যা হতো। অনেক সময় পানি জমে থাকায় কবর কাটতে গিয়ে পাড় ভেঙে পড়ার ঝুঁকিও থাকত। বর্তমানে এসব সমস্যার সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে গোরস্থানে উন্নয়ন কাজের অংশ হিসেবে নতুন করে মাটি ফেলার কারণে অনেক পুরোনো কবর কয়েক ফুট নিচে পড়ায় চিহ্ন আংশিকভাবে মুছে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ কারণে মৃত আত্মীয়স্বজনের কবরের স্থান নির্ধারণে গোরস্থানের সহকারী প্রকৌশলী ফিতা দিয়ে চারপাশের মাপ নিয়ে সঠিকভাবে কবরের জায়গা নির্ধারণ করে দিচ্ছেন। প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৮টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত এ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
গোরস্থান ও ঈদগাহ কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই বিশাল সংস্কার ও উন্নয়ন কাজে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে, যার সবই সাধারণ মানুষের দানের অর্থ। তাই এই মহতী উদ্যোগ বাস্তবায়নে সমাজের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে মুক্তহস্তে দান করার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানানো হয়েছে।
0 Comments