ড. মো. মনছুর আলম :
বর্তমান ইরানের শাসন ব্যবস্থা বিশ্বের অন্য যে কোনো দেশের তুলনায় আলাদা এবং পদ্ধতিতেও রয়েছে ভিন্নতা। অন্যান্য দেশের মতো ইরানে নির্বাচনের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট বা সংসদ সদস্যগণ নির্বাচিত হলেও দেশের মূল ক্ষমতা রয়েছে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার হাতে। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ছিলেন। তাৃকে হত্যার মধ্য দিয়ে একটা অধ্যায়ের সমাপ্তি হলো।যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে খোদ ইরান সরকার। আজ রোববার সকালে ইরানের রাষ্ট্র্রীয় সংবাদমাধ্যমে এই খবর প্রচার করা হয়। সেই সাথে ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক এবং ০৭ দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়।
১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার শাসন যুগের সূচনা হয়। একটি বিপ্লবের মাধ্যমে ইরানে রেজা শাহ পাহলভির রাজতন্ত্রকে উৎখাত করা হয়। তাকে উৎখাতের পর ইরানে ধর্মীয় প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর দেশটি দু'জন সুপ্রিম লিডার বা সর্বোচ্চ নেতা পেয়েছে। তাদের পদবী হিসেবে আয়াতুল্লাহ ব্যবহার করা হয়, শিয়া ধর্মাবলম্বীদের কাছে যার অর্থ সিনিয়র ধর্মীয় নেতা।
সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি দেশটির সামরিক বাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফ ছিলেন। এছাড়া দেশের সব বড়ো বা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তাঁর সম্মতি দরকার হতো। এমনকি ইরান পারমাণবিক ক্ষমতার অধিকারী হবে কিনা অথবা জাতিসংঘের আণবিক শক্তি সংস্থাকে সহযোগিতা করবে কিনা, এসবের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তিনিই দিতেন।
ইরানের সর্বোচ্চ এই ধর্মীয় নেতার শহীদ হওয়ায় পরবর্তী নেতা কে হবেন কিংবা কিভাবে নির্বাচিত হবেন সেই প্রশ্নও এখন সামনে আসছে। ইরানের কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থায় দেশটির জনগণের নেতা নির্বাচনে কার্যত কোন এখতিয়ার থাকে না। এমনকি সামাজিক মাধ্যমে কেউ খামেনির সমালোচনা করার উপায়ও ছিল না। সেজন্যও তাকে জেলে পর্যন্ত যেতে হতে পারতো।
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জন্ম, শৈশব, শিক্ষা-দীক্ষা সম্বন্ধে যা জানা যায়, ১৯৩৯ সালের ১৬ জুলাই উত্তর-পূর্ব ইরানের মাশহাদ শহরে এক ধর্মীয় পণ্ডিতের ঘরে জন্ম হয় আলী খামেনির। নিজ শহরের ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্রেই তাঁর পড়াশোনার হাতেখড়ি। অতঃপর শিয়া মুসলিমদের পবিত্র নগরী কোমে যান পড়াশোনা করতে। ১৯৬২ সালে তিনি শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির বিরুদ্ধাচরণকারী আয়াতুল্লাহ খোমেনির ধর্মীয় আন্দোলনে যোগ দেন। তরুণ আলী খামেনি ধীরে ধীরে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির একজন একনিষ্ঠ অনুসারী হয়ে ওঠেন। তাঁর নিজের ভাষায়, তিনি যা করেছেন এবং এখন যা বিশ্বাস করেন, সবই খোমেনির ইসলামী ভাবধারা থেকে প্রাপ্ত।
১৯৬৪ থেকে ১৯৭৮ সালের মধ্যে শাহ পাহলভির শাসনের বিরুদ্ধে সক্রিয় থাকার জন্য তিনি বহুবার গ্রেফতার হন।
১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লবের পর, আলী খামেনি বিপ্লবী পরিষদে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী হন এবং ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কোরকে (IRGC) সংগঠিত করতে সহায়তা করেন। এই বিপ্লবী গার্ড ইরানের অন্যতম শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। এভাবে তাঁর রাজনৈতিক উত্থান ঘটে।
১৯৮১ সালের জুন মাসে, তেহরানের একটি মসজিদে বোমা হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন। ওই হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ ছিল দেশটির বামপন্থী বিদ্রোহী গোষ্ঠীর ওপর। এই ঘটনায় তাঁর ডান হাত পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েন।দুই মাস পর, একই বিদ্রোহী গোষ্ঠী ইরানের রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ-আলী রাজাইকে হত্যা করে। রাজাইয়ের মৃত্যুর পর তার উত্তরসূরী হিসেবে আলী খামেনি ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
১৯৮১ থেকে ১৯৮৯ পর্যন্ত তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট ছিলেন।আট বছর ধরে আনুষ্ঠানিকভাবে এই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন তিনি। এই সময় তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মীর হোসেইন মুসাভির সাথে নানা মতবিরোধে জড়িয়ে পড়েন। কারণ তিনি মনে করতেন, মুসাভি ইরানের শাসন ব্যবস্থায় অতিরিক্ত সংস্কার আনতে চাইছেন।
১৯৮৯ সালের জুনে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর বিশেষজ্ঞ পরিষদ (ধর্মীয় আলেমদের একটি পরিষদ) আলী খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত করে। সে সময় শুক্রবারের জুমার নামাজের বিরল এক খুতবায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বলেন, "বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় তিনি মর্মাহত"। তবে তিনি তখন সামরিক বাহিনীর পক্ষই নিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ইরানের শত্রুরা এই ট্র্যাজেডিকে কাজে লাগিয়ে ফায়দা নেয়ার চেষ্টা করছে। তবে তিনি আজীবন পশ্চিমাবিরোধী কঠোর রক্ষণশীল এবং ইরানের ওপর মার্কিনি নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান বজায় রেখে চলেছেন। মূলত এ কারণে ইরানে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়লে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি প্রথম দিকে করোনা ভাইরাসের হুমকিকে খাটো করে দেখেছিলেন, বলেছিলেন যে ইরানের শত্রুরা এটিকে ভয় দেখানোর কৌশল হিসেবে অতিরঞ্জিত করছে।
২০২১ সালে ইরানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ঘনিষ্ঠ কট্টরপন্থী ধর্মীয় নেতা ইব্রাহিম রাইসি। চলতি বছরের জুনে ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ১৯ মে ইব্রাহিম রাইসি এক হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় মারা গেলে প্রেসিডেন্ট পদটি শূন্য হয়ে যায়। রাইসির মৃত্যুর পর জুলাইয়েই ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন সংস্কারপন্থী নেতা মাসুদ পেজেশকিয়ান।
প্রায় ৮৬ বছর বয়সী আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি স্বাস্থ্যগত নানা সমস্যায় ভুগছিলেন বেশ কয়েক বছর ধরে। তিনি মারা গেলে বা পদত্যাগ করলে কে হবেন ইরানের পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা, এই প্রশ্ন ঘিরে জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই। তবে তাঁর জায়গায় আসছেন তার ছেলে মোজতবা খামেনি একথা নিশ্চিত ভাবে বলা যায়। এখন শুধুমাত্র অফিসিয়াল কনফার্মেশনের অপেক্ষা।
২৮ ফেব্রয়ারি, ২০২৬ খ্রি. তাঁর ইন্তেকালের মধ্য দিয়ে একটি যুগের, একটি ইতিহাসের, একটি সাহসের প্রতীকের অবসান ঘটলো। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইসলামের এই শ্রেষ্ঠ রাহবারকে শহীদ আলী খামেনিকে জান্নাতুল ফেরদৌসের মেহমান করুন আমিন।
0 Comments