ড. মো. মনছুর আলম
ছায়া মন্ত্রিসভা ওয়েস্টমিন্সটার সরকার পদ্ধতির একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এ সভায় সংসদের প্রধান বিরোধীদলীয় নেতার নেতৃত্বে বিরোধী দল থেকে একদল জ্যৈষ্ঠ সংসদ সদস্য একটা মন্ত্রিসভা গঠন করেন যেটা সরকারের মন্ত্রিসভার বিকল্প হিসেবে কাজ করে। এখানে, প্রতিটি সরকারি মন্ত্রীদের বিপরীতে বিরোধী দল থেকে একজন ছায়া মন্ত্রিসভার সদস্য থাকেন যিনি সরকারি মন্ত্রীর কাজকে বিশ্লেষণ করেন এবং প্রয়োজনে বিকল্প পথ বা সংশোধনী তুলে ধরেন। অধিকাংশ দেশে ছায়া মন্ত্রিসভার সদস্যকে ছায়া মন্ত্রী বলা হয়ে থাকে। এখন প্রশ্ন হলো বাংলাদেশে এ ধরনের মন্ত্রিসভার আদৌ প্রয়োজন আছে কী? এক কথায় বলা যায় বর্তমান প্রেক্ষিতে প্রয়োজন আছে। এবার আসা যাক ছায়া মন্ত্রিসভা (shadow cabinet) আসলে কী? তাদের কাজ কী? ছায়া মন্ত্রীরা সরকারি বেতন পান কিনা?
উত্তরে বলা যায়, সরকারে যেমন প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের জন্য একজন করে মন্ত্রী থাকবেন বিরোধী দলও ঠিক তেমনি প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের বিপরীতে একজন করে ছায়া মন্ত্রী নিয়োগ দিবেন। সরকার যদি কোনো ভুল করে বা ব্যর্থ হয়, ছায়া মন্ত্রী তার প্রতিবাদ করবেন এবং বিকল্প সমাধান পেশ করবেন। হ্যাঁ, বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে অবশ্যই প্রয়োজন আছে। বিশেষ করে বিশেষ প্রেক্ষিতে ত্রয়োদশ নির্বাচনের বাস্তবতায়।
ছায়া মন্ত্রীরা কি সরকারি বেতন বা সুবিধা পান?
না। ছায়া মন্ত্রিসভার সদস্যরা সরকার থেকে কোনো বেতন, গাড়ি বা সরকারি সুবিধা পান না। এটি সম্পূর্ণ একটি স্বেচ্ছাসেবী রোল। তবে এটি জনগণকে দেখানোর একটা বিশাল সুযোগ যে, তারা দেশ চালানোর জন্য কতটা যোগ্য।
ছায়া মন্ত্রিসভা কেন প্রয়োজন?
যখন কোনো মন্ত্রী জানেন যে তার প্রতিটি সিদ্ধান্তের চুলচেরা বিশ্লেষণ করার জন্য ওপাশে একজন দক্ষ ছায়া মন্ত্রী এবং একঝাঁক গবেষক বসে আছেন, তখন তিনি চাইলেই খেয়ালখুশি মতো কাজ করতে পারেন না। এটি রাজপথের পেশিশক্তির রাজনীতি কমিয়ে পলিসির রাজনীতি চালু করতে সাহায্য করে। কারণ ভালো একজন ছায়া মন্ত্রী হতে হলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে গভীর জ্ঞান ও গবেষণা থাকা প্রয়োজন।
এভাবে রাজনীতিতে মারামারির বদলে শুরু হতে পারে মেধা ও আইডিয়ার লড়াই। কে কত ভালোভাবে জনগণের টাকার সদব্যবহার করতে পারে, সেই প্রতিযোগিতা। তাছাড়া সংস্কারের এই যুগে এটা এক ধরনের আধুনিক সংযোজনও বলা যেতে পারে।
ছায়া মন্ত্রিসভা কীভাবে পেশিশক্তির বদলে পলিসির রাজনীতি আনতে পারে?
বর্তমানে আমাদের রাজনীতিতে একজন নেতা কত বড়, তা মাপা হয় তার কত বড় মিছিল আছে বা তিনি কত জোরে স্লোগান দিতে পারেন তার ওপর। কিন্তু ছায়া মন্ত্রিসভা এলে মাপকাঠি হবে যোগ্যতা। উদাহরণস্বরূপ: একজন ছায়া স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে অবশ্যই চিকিৎসা ব্যবস্থা ও তৎসম্পর্কিত বিষয় সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখতে হবে। একজন ছায়া অর্থমন্ত্রীকে বাজেটের চুলচেরা বিশ্লেষণ করার যোগ্যতা থাকতে হবে। ফল স্বরূপ জনগণ দেখবে প্রকৃতপক্ষে কার কাছে উন্নততর সমাধান বা সেবা আছে।
ছায়া মন্ত্রিসভা কার্যকর করার শর্ত কী কী?
ছায়া মন্ত্রিসভা তখনই কার্যকর হবে যখন তারা কেবল বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা না করে গঠনমূলক সমাধান দিতে পারবে। যদি ছায়া মন্ত্রিসভা কেবল নামেই থাকে কিন্তু কোনো গবেষণা বা তথ্যনির্ভর কাজ না করে, তবে এটি কোনো কাজে আসবে না। ছায়া মন্ত্রীরা যদি কেবল টিভিতে টকশো করার জন্য পদটি ব্যবহার করেন কিন্তু মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ না করেন, তবে এই মডেলটি ব্যর্থ হবে।
ছায়া মন্ত্রিসভা নাম সর্বস্ব নাকি বর্তমান বাস্তবতা?
বাঙালি চরিত্র বাস্তবতায় এটা কেবল পদবী সর্বস্ব হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। অনেকেই হয়তো ছায়া মন্ত্রীর মর্যাদা নিতে চাইবেন, কিন্তু কাজের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা থাকবে না ও গবেষণায় শ্রম দিতে চাইবেন না।
তবে আমাদের উচিত হবে দু-একটি মন্ত্রণালয়ে এটি পরীক্ষামূলকভাবে কিংবা সফলভাবে প্রয়োগ করা যেতে পারে। এতে করে যে সকল মন্ত্রী সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করছেন না তাদের চাপের মুখে রাখাও সম্ভব হবে এবং সর্বোপরি বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন বা সংস্কারের সংযোজন হতে পারে বলে মনে হয়।
(লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও নদী গবেষক, পাবনা)।
0 Comments