ড. মো. মনছুর আলম
বাংলাদেশের অন্যতম পাহাড়ি জনপদ রাঙ্গামাটি। সবুজ পাহাড়ের দিগন্ত বিস্তৃত সৌন্দর্য এবং পাহাড়ের ডালে ডালে স্বচ্ছ নীল জলের আলিঙ্গন; মনের অজান্তেই কণ্ঠ বেয়ে চুঁইয়ে পড়বে 'লাল পাহাড়ির দেশে যা...।' শীত মৌসুমে রাঙ্গামাটি ভ্রমণ করার জন্য উৎকৃষ্ট সময়। এসময় কাপ্তাই লেকের বুকে স্পিডবোট, নৌকা, এমনকি জাহাজ নিয়ে অনায়াসে ঘুরে দেখা যায়। তবে মেঘের সাথে পাহড়ের মিতালি দেখতে চাইলে বর্ষাকলে যাওয়াই উত্তম। কাপ্তাই বাঁধের কারণে যদিও গোটা রাঙ্গামাটি জেলাই লেকে পরিণত হয়েছে তবুও এর বুকচিরে বয়ে চলা লেকের বাঁকে বাঁকে রয়েছে অসংখ্য বৈচিত্রের ভান্ডার। স্বচ্ছ নীলাভো লেকের জলে ঝিরি ঝিরি বাতাসের আনাগোনা আপনাকে বিমোহিত করবেই।
রাঙ্গামাটি জেলার উত্তরে খাগড়াছড়ি ও ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য, দক্ষিণে বান্দরবান, পূর্বে ভারতের মিজরাম রাজ্য এবং পশ্চিমে চট্টগ্রাম। বাস যোগে ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে সরাসরি রাঙ্গামাটি যাওয়া যায়। চট্টগ্রাম থেকে বিআরটিসি অথবা পাবলিক বাসে মাত্র ২০০ টকার মধ্যে যে কোনো বাসে চেপে রাঙ্গামাটি শহরে যেতে পারবেন।
রাঙ্গামাটির কথা মনে পড়েলে প্রথমেই কল্পলোকে যে ছবিটি মনের কোনে ভেসে ওঠবে সেটি হলো ক্যালেন্ডারের পাতায় স্থান পাওয়া রঙ্গিন একটি ঝুলন্ত সেতু। রাঙ্গামাটি পর্যাটন কম্পেক্সের ভিতর রয়েছে এই ঝুলন্ত সেতুটি। সেতুর পাশেই পাবেন লেকে বেড়ানো জন্য রাখা সারিবদ্ধ ছোটো বড়ো নৌকা, স্পিডবোট। আপনার পছন্দমত ৮০০ শ অথবা ১ হাজার টাকায় এক ঘন্টার জন্য ভাড়া নিয়ে পরিবারসহ ঘুরে দেখতে পরেন। দিনব্যাপী পরিবার ঘুরবার জন্য গুণতে হবে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা। এছাড়া গণনৌযানেও স্বল্প খরচে লেক ঘুরে দেখতে পরেন। তবে রিজার্ভ বাজার থেকেও বিভিন্ন সাইজের নৌকা ভাড়া করতে পারেন ৪৫০ টাকা থেকে ২০০০ টাকার বিনিময়।
রূপের রানি রাঙ্গামাটির দর্শনীয় স্থানের মধ্যে রয়েছে উপজাতীয় যাদুঘর, ঝুলন্ত সেতু, রাজবন বিহার, চাকমা রাজার বাড়ি, বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু প্রাকৃতিক ঝর্ণা শুভলং, পেদা টিং টিং, তবলছড়ি বাজার, রিজার্ভ বাজার, কশেলং মাইনিমুখ, বুড়িঘাট, রাঙ্গাপানি, কর্ণফুলি কাগজকল, বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র, কাপ্তাই বাঁধ এবং সাজেক ভ্যালি অন্যতম।
নৌ-বিহারে যা দেবেন
শুভলং যাবার পথে পেদা টিং টিং নামক অবকাশ কেন্দ্রে নাস্তা সেরে নিতে পারেন কারন সামনে আর কোন হোটেল চোখে পড়বে না। তবে দর দাম না করে কোন খাবারের অর্ডার দেয়া নিতান্তই বোকামী হবে। একটা কথা জানিয়ে রাখি যেহেতু রাঙ্গামাটির বুক চিরে চলে গেছে লেক তাই কোন পর্যটন কমম্পেক্সে যেতে আপনাকে সড়ক পথে ভ্রমণ করার দরকার হবে না। সবগুলো স্পটেই আপনি ইঞ্জিন নৌকায় চড়ে যেতে পারবেন। লেকের পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা সুউচ্চ পাহাড় আপনার মনকে এতই নাড়া দিবে যে মন চাইবে এখানেই আবাস গড়তে। এত সুন্দর আমাদের দেশ ! অথচ আমরা চলেছি মনের খোরাক মিটাতে ভিন দেশে? একবার নিজের দেশ ঘুরুন দেখবেন কত সুন্দর এই সুজলা, সুফলা, শস্য, শ্যামলা আমাদের এই বাংলা। তার পর না হয় বিদেশ যাওয়া যাবে। ৩০০ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট শুভলং ঝর্ণা থেকে ঝরে পড়া অবিরাম পানির ধারা চোখের নাগালে আসা মাত্রই আপনার ঝালা পালা কানের তালা একেবারেই পরিষ্কার হয়ে যাবে। বিষ্ময় দৃষ্টিতে চেয়ে থাকবেন ওটার দিকে; গোসল করার যাবতীয় উপকরন সঙ্গে নিতে ভুল করবেন না। স্বচ্ছ পানিতে গোসল না সেরে ফিরতি পথ ধরলে আপনার মন অতৃপ্ত রয়েই যাবে।
যখন ফেরার পথ ধরবেন মনে হবে কি যেন একটা রেখে চলেছেন এই কাপ্তাই লেকের বুকে ! বিষণ্ন মনে যান্ত্রিক জীবনে প্রবেশ করলেও সেই আনন্দক্ষণ মূহুর্তটাকে মনের কোনে রেখে দিতে পারবেন দীর্ঘদিনের স্মৃতি হিসাবে। যারা এই নয়নাভিরাম ও অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাখেলা দেখতে চান বা উপভোগ করতে চান বা স্মৃতির পাতায় এই অপরূপ দৃশ্য বাঁধিয়ে রাখতে চান তারা আর দেরি না করে উপভোগ করে আসুন রাঙামাটি।
সড়ক পথে
সড়ক পথেও এডভেঞ্চার করতে পারেন। নৌপথে কাপ্তাই যাবার পর যদি মনে করেন পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তায় একটু এডভেঞ্চার করবো তাহলে কাপ্তাই থেকে ৬০০/৭০০ টকায় একটা সিএনজি চালিত অটো নিয়ে আসাম বাজার পথে আবার রাঙ্গামাটি ফিরে আসতে পারেন। এই রাস্তাটি নতুন হয়েছে। পাহাড় লেকের বুকচিরে তৈরি রাস্তার সৌন্দর্য, নীল পহাড়ি আলিঙ্গন, নেভি ক্যাম্প, আনসার ক্যাম্প, আদিবাসী গ্রাম, সমাজ, বাজার, আসাম বাজার, বস্তি বাজার, রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আরও কত কি দেখতে পারবেন আর মনের অজান্তেই গেয়ে চলবেন 'গ্রাম ছাড়া এই রাঙামাটির পথ আমার মন ভোলায় রে...।'
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের অন্যতম দর্শনীয় স্থান সাজেক ভ্যালি রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার অন্তর্গত একটি বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র, যা মূলত মিজোরাম সীমান্তের কাছে অবস্থিত এবং পাহাড়, মেঘ ও প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত; এটি খাগড়াছড়ির দীঘিনালা থেকে যাওয়া সহজ হওয়ায় অনেকে খাগড়াছড়ির অংশ হিসেবে মনে করেন। সাজেক ভ্রমণের জন্য খাগড়াছড়ি শহর থেকে কিংবা খাগড়াছড়ির পথ ব্যবহার কারাই শ্রেয়। সাজেক ভ্রমণের জন্য খোলা জিপ বা চাঁদের গাড়ি ভাড়া পাওয়া যায়।
0 Comments