এ কে খান পিভিএম :
রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে স্বল্পতম সময়ে রেকর্ড সংখ্যক ৩ হাজার ২১১ জন আনসার সদস্যকে দায়িত্ব পালনের জন্য প্রস্তুত করেছে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী। এর মধ্যে ৩ হাজার ১২৫ জন নবীন সৈনিক এবং ৮৬ জন উপজেলা আনসার প্রশিক্ষক রয়েছেন। প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজে একসঙ্গে এত বিপুল সংখ্যক সদস্যের অংশগ্রহণ আনসার বাহিনীর ইতিহাসে এক অনন্য ও নজিরবিহীন রেকর্ড হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এ উপলক্ষে সোমবার ১২ জানুয়ারি গাজীপুরের সফিপুরে বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি একাডেমির ইয়াদ আলী প্যারেড গ্রাউন্ডে অনুষ্ঠিত হয় সমাপনী কুচকাওয়াজ। এতে ৪১তম বিসিএস আনসার ক্যাডার কর্মকর্তাদের ২১তম মৌলিক প্রশিক্ষণ কোর্স, নবনিযুক্ত থানা, উপজেলা আনসার-ভিডিপি প্রশিক্ষক ও প্রশিক্ষিকাগণের মৌলিক প্রশিক্ষণ এবং আনসার ব্যাটালিয়নের ২৬তম ও ২৭তম ব্যাচ পুরুষ রিক্রুট সিপাহীদের মৌলিক প্রশিক্ষণ কোর্সের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মাননীয় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা অবঃ লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ। প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে স্বল্পতম সময়ে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় এই বিপুল সংখ্যক সদস্যকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, সাধারণত এ ধরনের প্রশিক্ষণ দীর্ঘমেয়াদি হলেও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষক সহায়তায় গতিশীল ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তা সফলভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে। এটি আনসার বাহিনীর সাংগঠনিক সক্ষমতা ও পেশাদারিত্বের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
বক্তব্যের শুরুতে তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মত্যাগকারী শহীদদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে নিহত শহীদদের প্রতিও শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তিনি বলেন, রাষ্ট্রের প্রতিটি সংকটময় সময়ে আনসার ও ভিডিপি সদস্যরা সাহসিকতা, আত্ম নিবেদন ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা উল্লেখ করেন, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থান-বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তিনি পার্বত্য অঞ্চলে কর্মরত প্রায় ২০ হাজার আনসার ব্যাটালিয়ন ও হিল আনসার–ভিডিপি সদস্যদের অবদানের কথা তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব ও পুলিশের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার একটি গৌরবময় ঐতিহ্য এই বাহিনীর রয়েছে। আনসার ও ভিডিপি বাহিনীর আধুনিকায়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বাহিনীর পেশাগত উৎকর্ষ, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সদর দপ্তর থেকে তৃণমূল পর্যন্ত ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা কার্যকর করেছে। সকল সদস্যকে AVMIS সফটওয়্যারের আওতায় আনা হয়েছে এবং সদস্যদের আর্থসামাজিক উন্নয়নে ‘সঞ্জীবন’ প্রকল্পসহ বিভিন্ন কল্যাণমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে আয়োজনের লক্ষ্যে আনসার ভিডিপি বাহিনী সুপরিকল্পিত প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। একই সঙ্গে তিনি সদস্যদের যেকোনো ধরনের অনৈতিক, পক্ষপাতমূলক ও দায়িত্ববহির্ভূত কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার কঠোর নির্দেশনা দেন। দুর্নীতিকে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শত্রু আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, আনসার ভিডিপি কোনো রাজনৈতিক দলের বাহিনী নয়, এটি একটি নিরপেক্ষ রাষ্ট্রীয় বাহিনী। সততা, মানবিকতা ও পেশাদারিত্বই হবে এই বাহিনীর মূল পরিচয়। অনুষ্ঠান শেষে কৃতি ও শ্রেষ্ঠ প্রশিক্ষণার্থীদের হাতে সম্মাননা ও পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। ৪১তম বিসিএস আনসার ক্যাডার মৌলিক প্রশিক্ষণে চৌকস প্রশিক্ষণার্থী নির্বাচিত হন সহকারী পরিচালক মোঃ শামীম রেজা, সেরা ফায়ারার সহকারী পরিচালক অমিত কুমার ঘোষ এবং সেরা ড্রিলে সহকারী পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম। থানা ও উপজেলা প্রশিক্ষক মৌলিক প্রশিক্ষণে চৌকস ও সেরা ফায়ারার হন মোঃ সোহানুর রহমান রাসেল এবং সেরা ড্রিল নির্বাচিত হন মোছা. আশা মনি খাতুন। এ ছাড়া আনসার ব্যাটালিয়নের ২৬তম ব্যাচে চৌকস নবীন সিপাহি নির্বাচিত হন মো. সেলিম শাহরিয়ার, সেরা ফায়ারার রবিন মিয়া এবং সেরা ড্রিল আল রাব্বি। ২৭তম ব্যাচে চৌকস নবীন সিপাহি হন মো. মারুফ রানা, সেরা ফায়ারার মো. রাশেদ খান এবং সেরা ড্রিল নির্বাচিত হন মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন।
নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে এই সমাপনী কুচকাওয়াজ শুধু একটি প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের সমাপ্তি নয়, বরং এটি রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং মানবিক ও নিরপেক্ষ নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রতি আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর দৃঢ় অঙ্গীকারের প্রতিফলন। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নবীন সদস্যদের সততা, শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধই প্রমাণ করে আনসার ভিডিপি আজও রাষ্ট্র ও জনগণের সেবায় একটি নির্ভরযোগ্য শক্তি। অনুষ্ঠানে বাহিনীর অতিরিক্ত মহাপরিচালক, উপমহাপরিচালকগণ, বাহিনীর বিভিন্ন পদমর্যাদার কর্মকর্তা, কর্মচারী, প্রশাসনের কর্মকর্তা, ব্যাটালিয়ান আনসার, ভিডিপি সদস্য, নানা শ্রেণির কর্মকর্তা ও প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।
0 Comments