মাসুদ রানা তুহিন, রাজশাহী প্রতিনিধি :
উত্তরবঙ্গের ফসলের মাঠে এখন এক অদ্ভুত নীরবতা। এই নীরবতা ফসলহীনতার নয়, বরং প্রাপ্ত ফসল নিয়েও অসহায় হয়ে পড়া মানুষের। দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, নীলফামারী কিংবা রংপুরের বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে আলুর বাম্পার ফলন হয়েছে। কিন্তু সেই ফলনই আজ কৃষকের জন্য আশীর্বাদ নয়, এক গভীর দুশ্চিন্তার কারণ।
মৌসুমের শুরুতেই কৃষকেরা আশায় বুক বেঁধেছিলেন। ভালো ফলন হলে হয়তো বিগত বছরের ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়া যাবে। কিন্তু মাঠের হিসাব আর বাজারের হিসাব এক হলো না।
আলুর দাম এমন পর্যায়ে নেমে এসেছে যে উৎপাদন খরচই উঠছে না। কোথাও কোথাও প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে এত কম দামে যে কৃষক তা তুলতে গেলেও লোকসান, আর না তুললেও লোকসান।
এরই মধ্যে নতুন করে আঘাত হেনেছে প্রকৃতি। অকাল ঝড়-বৃষ্টি কৃষকের সেই সামান্য আশাটুকুও ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। অনেক জায়গায় জমিতে পানি জমে থাকায় আলু তোলা যাচ্ছে না। যেসব আলু তোলা হয়েছে, সেগুলোও ঠিকমতো শুকাতে না পেরে পচে যাচ্ছে। খোলা আকাশের নিচে রাখা আলু বৃষ্টির পানিতে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে প্রতিদিনই।
ঠাকুরগাঁওয়ের এক কৃষক বলেন, “আলু তুলতে পারছি না, তুললেও বিক্রি করার দাম নেই। হিমাগারে রাখতে গেলেও জায়গা নেই, ভাড়াও বেশি। এখন বুঝতে পারছি না কী করবো।”
এই কথার মধ্যে শুধু একজনের কষ্ট নয়, বরং পুরো অঞ্চলের হাজারো কৃষকের অসহায়তার প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে।
রংপুর ও নীলফামারীর অনেক হিমাগার ইতোমধ্যেই পূর্ণ হয়ে গেছে। যারা আগে বুকিং দিতে পারেননি, তারা এখন আলু সংরক্ষণের সুযোগ পাচ্ছেন না। আবার অনেকের পক্ষে হিমাগারের ভাড়া বহন করাও সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বাধ্য হয়ে কম দামে আলু বিক্রি করে দিচ্ছেন, অথবা জমিতেই ফেলে রাখতে হচ্ছে।
পঞ্চগড় ও দিনাজপুরের বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, কৃষকেরা ট্রাকভর্তি আলু নিয়ে বাজারে ঘুরছেন–কিন্তু ক্রেতা নেই।
পাইকাররা কম দামে কিনতে চাইলেও কৃষকেরা তাতে রাজি হতে পারছেন না, কারণ এতে সরাসরি লোকসান। এই অচলাবস্থায় পড়ে অনেকেই ঋণের বোঝা বাড়ার আশঙ্কায় দিন গুনছেন।
এমন পরিস্থিতিতে কৃষকের কণ্ঠে শোনা যাচ্ছে হতাশা আর ক্ষোভের মিশ্র সুর। তারা বলছেন, উৎপাদনের সময় যেমন কোনো নিশ্চয়তা থাকে না, তেমনি বাজার ব্যবস্থাপনাতেও নেই কোনো স্থিতিশীলতা। ফলন ভালো হলেও ন্যায্য দাম না পেলে সেই ফলনের কোনো মূল্য থাকে না।
এই সংকট কেবল কৃষকের নয়, বরং সামগ্রিক কৃষি অর্থনীতির জন্যও এক বড় সতর্কবার্তা। প্রয়োজন কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনা, সংরক্ষণ সুবিধা বাড়ানো এবং কৃষকের জন্য ন্যূনতম মূল্য নিশ্চিত করা। পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি ও সহায়তাও জরুরি।
উত্তরবঙ্গের এই কান্না যেন নিছক মৌসুমি ঘটনা না হয়ে ওঠে, এটাই এখন সবার প্রত্যাশা। কারণ কৃষক বাঁচলে কৃষি বাঁচবে, আর কৃষি বাঁচলে তবেই বাঁচবে দেশের অর্থনীতি।
0 Comments